রাজনীতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রাজনীতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ১৫ জুলাই, ২০১৩

দৈনিক কথন, ১৫ জুলাই ২০১৩

আজকে সকালের ঘুমটা ভেঙ্গেছে অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখে। থিসিস ডিফেন্সে আমি আমার স্পিচ দিচ্ছি। সামনে বসে আছেন আমাদের শ্রদ্ধেয় সুরাইয়া পারভিন ম্যাডাম, রাজ্জাক স্যার আর সামিউল্লাহ স্যার। এদের মধ্যে সুরাইয়া ম্যাডাম আর সামিউল্লাহ ভাইয়ের কোন আগ্রহই নাই আমি কি বলছি সেটাতে। কেবল রাজ্জাক স্যার খুব মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনছে আর মিটিমিটি হাসছে। এদিকে আমি স্যারের রহস্যময় হাসিতে পুরাপুরি বিভ্রান্ত হয়ে আমতা আমতা করছি। আমি যতই এভাবে আমতা আমতা করছি, স্যারের মুখের হাসি ততই প্রসারিত হচ্ছে। একসময় স্যার অনেকটা আগের কালের বাংলা সিনেমার নায়কদের মত "মুহাহাহা" টাইপের হাসি দেওয়া শুরু করল। আর সেই হাসির শব্দে আমার ঘুম  গেল ভেঙ্গে। উঠে দেখি স্যার হাসছে না, আমার মোবাইল বাজতেছে। ধরার আগেই লাইনটা ছেড়ে গেল। দেখি সাদ ফোন দিছে। আজকে আমার থিসিসের ভাইভা হওয়ার কথা, সকালে উঠে হলে যাব ... আসিফের সাথে কাজ করবো বলে। এর মধ্যে সাদ আবার ফোন করে ক্যান? ওকে ফোন ব্যাক করতেই ও দুঃসংবাদটা দিল। আমার মেধাবী হওয়ার সর্বশেষ সুযোগটা আমি হাতছাড়া করলাম।

ব্যাপারটা খোলসা করি। আজকে আমার থিসিস ডিফেন্স ছিল। আজকেই আবার যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত গোলাম আজমের রায় হবে। সেই উপলক্ষে জামাত-ই-ইসলামী হরতাল ডেকেছে। এর মধ্যে কি থিসিস ডিফেন্স হবে? এই ব্যাপারে ডিপার্টমেন্টের হাব-ভাব গতকাল পর্যন্ত ছিল অনেকটা এমন যে, "অনেক হইছে বাপু ... আর না ! এইবার পরীক্ষাটা শেষ কর ! আর হরতালের মধ্যে পরে কেউ মারা গেলে তো বেঁচেই গেলা ! পুরাই মেধাবী !" এহেনো কঠিন অবস্থান থেকে সরে এসে ডিপার্টমেন্ট মুটামুটি সহজ একটা পথে হাঁটার চেষ্টা করল। পরে জানানো হবে এই মর্মে একটা নোটিশ ঝুলায়ে দিল আমাদের সামনে। এরমানে সহজ, আজকে অফিসে যেতে হবে।

ঘুমটুমের কথা ঝেড়ে ফেলে দ্রুত যোবায়েরকে ফোন দিয়ে বের হতে বললাম। একটা সিএনজি নিয়ে চলে গেলাম অফিসে। অফিসে আবার এই রোজার মধ্যে একেবারেই সময় কাটে না। খাওয়া দাওয়া নাই, কিছু নাই। সময় কাটবে কিভাবে ? কোমড়টা চেয়ারে দিতেই হঠাৎ অনুভব করলাম, জ্বর তাহার সকল শক্তি নিয়ে এগিয়ে আসছে। মাথাটা ঘুড়েও উঠলো মনে হইল। মনেহয় থিসিস ডিফেন্স নিয়ে অতিরক্ত চিন্তার কারনে ব্যাপারটা হইছে। চোখে মুটামুটি অন্ধকার দেখা শুরু করলাম, কোন দিকে তাকাতেই পারছি না ! মাথাটা নিচু করে কতক্ষন চুপচাপ বসে থাকলাম। দেখি কাজ হয় না। যাই হোক, অফিসে খুব বেশি প্রেশার না নিয়ে থাকলাম সারাদিন। অবশ্য মনের মধ্যে কুট কুট করতেছিল, কারন আমি এরমধ্যে অনেকটা দিন ছুটি নিয়ে নিয়েছি অফিস থেকে, থিসিসের কাজের জন্য। অসুস্থ হয়ে গেলে আবার পাইন, বুঝলাম দ্বায়িত্ব জ্ঞান বাড়ছে।

দুপুরের দিকে অফিসে অমি আপুর ডেস্কের দিকে তাকাতেই মনে পরলো জামাত-ই-ইসলামী বাংলাদেশের সাবেক নায়েবে আমির গোলাম আজমের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের করা যুদ্ধাপরাধের বিচারের রায় হবে আজকে। কয়েকটি অনলাইন পত্রিকার সাইটে ঢুকলাম। আগে থেকেই আমার মনে হচ্ছিল গোলাম আজমের রায়ে সরকার একটা বিশেষ কিছু করবে। আমার এরকমটা মনে হওয়ার কারনটা বলি আমার দৃষ্টিভঙ্গী থেকে। এই গোলাম আজমের বিচারের কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে মুটামুটি মাসখানেকের বেশি আগে। ব্যাপারটাকে দ্রুত সামনে থেকে সরায়ে ফেলা হয়েছে, কারন সরকার চায় যখন দেশের মানুষকে আরেক দফা মূলা খাওয়াতে হবে, তখনই ব্যাপারটাকে সামনে নিয়ে আসা হবে। আরেকটা ব্যাপার ছিল যে, গোলাম আজমের বয়স এখনই মুটামুটি ৯০ বছরের মত। সো উনাকে যদি বয়স বিবেচনায় ফাঁসি না দেওয়া যায়, জনগন আবার ব্যাপারটা নিয়ে বেশ কিছুদিন লাফালাফি করবে।

ব্যাপারটার সাথে বর্তমান অবস্থাটা মিলিয়ে নিন। বিসিএস এর কোটা নিয়ে দেশের ছাত্রসমাজের মধ্যে একটা চাপা ক্ষোভ কাজ করছে। এরমধ্যে কয়েক দফা আন্দোলনও করেছে সাধারন ছাত্রছাত্রীরা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই আন্দোলনে মাথানত করে পিএসসি এর মধ্যে আরেকটি রিভাইজড ফল প্রকাশ করেছে। এইনিয়ে অনেকের মধ্যেই চাপা সন্দেহ ছিল এই যে, এই পুনঃপ্রকাশিত ফলাফল হয়ত আইওয়াশ। বর্তমান আন্দোলনে প্রলেপ দিতে এই ফল প্রকাশ করা হয়েছে, যাদেরকে নতুন করে বিবেচনায় নেওয়া হল ... তাদেরকে হয়ত পরের স্টেজেই বাদ দেওয়া হতে পারে। সো, সরকারী চাকুরীর ক্ষেত্রে বিভন্ন "কোটা"র বিরুদ্ধে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল সেটাই হয়ত আবারো শুরু হত। আর সকলেই কম বেশি জানেন, দেশের ছাত্র সমাজের আন্দোলনের ফলাফল কতদূর পর্যন্ত গড়াতে পারে।

এই অবস্থাতেই যেহেতু গোলাম আজমের রায়টা দেওয়া হচ্ছে, সো, কিছু একটা হয়ে থাকতে পারে বলে আমার সন্দেহ হচ্ছিল আগে থেকেই। দুপুর নাগাদ জানতে পারলাম, যেরকমটা ভাবছিলাম সেরকমই একটা ঘটনা ঘটে গিয়েছে। গোলাম আজমকে ৯০ বছর কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। সাথে সাথে জনগনের দৃষ্টি ঘুড়ে গেল, সবারই এখন প্রশ্ন, '৭১এ স্বাধীনতার সময় শিশু ও বৃদ্ধদেরকে মারার সময় কি বয়স বিবেচনা করা হয়েছিল?

আমি এইব্যাপারটাতে যখনই  কোন মন্তব্য করতে যাব তখনই নেটে দেখলাম গতকাল আওয়ামী লীগের কিছু নেতার সাথে জামাত-ই-ইসলামী বাংলাদেশ এর কিছু নেতার মিটিং হয়েছে বাংলাদেশের আমেরিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে। সেখানে আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে ছিল দরবেশ সালমান এফ রহমান, আর বিচিত্র গহর রিজভী। বুঝে গেলাম, সমঝোতাটা শুধু শুধু আসে নাই। কিছু মাল-পানির লেনদেনও হতে পারে। যাই হোক, আমি রাজনীতির এত গভীরে নিজেকে প্রবেশ করাতে চাই না। আওয়ামী লীগ যদি মনে করে এই বিচারের রায় নিয়ে আতাঁত করলেই তাদের পিঠ বাঁচাতে পারবে, তাহলে তারা মস্ত বড় ভুলের দুনিয়াতে আছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিঃসন্দেহে অনেক কঠিন একটা ব্যাপার। কারন, এই ব্যাপারের বহু দেশ ও সংস্থার চাপ থাকবে। এটাই স্বাভাবিক। আমেরিকা, ইংল্যান্ড হতে শুরু করে আমাদের মুসলিম ভাইদের দেশ সৌদি আরব কিংবা পাকিস্তান ... ওআইসি, কিংবা আরব লীগ, সবাই এই ব্যাপারটাতে যে চাপ দিবে সেইটা তো আমিই বাসায় বসে জানতাম। আর আমি বাসায় বসে বসে পেপার পত্রিকা পড়ে যেটা বুঝতে পারলাম, সরকার সেই ব্যাপারটাই যে একেবারেই বুঝতে পারে নাই, আর যেই হোক, আমি বিশ্বাস করি না। প্রশ্ন হচ্ছে, চাপে যদি নত স্বীকার করতেই হয়, তাহলে কেন দেশের মানুষের আবেগকে উষ্কে দেওয়া হল ? সরকারটা না একেবারে বোকা !

আমার লেখায় আবার ফিরে আসি। বাসায় এসেই গড়িয়ে পরলাম বিছানাতে। আসরের নামাজটাও গেল সাথে। ঘুম থেকে উঠছি যখন মাগরীবের আযান দিচ্ছে তখন। উঠেই ইফতারী সারলাম। শরীর বেশি খারাপ করছে। জ্বরের সাথে এখন বোনাস আকারে সর্দিও জুটে গেছে। কাল অফিস কিভাবে করবো বুঝতেছি না। অফিস কামাই দিতে আর ইচ্ছা করে না। দ্বায়িত্ব বোধ, সবই দ্বায়িত্ববোধ যে !

শনিবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

সাম্প্রতিক রাজনীতি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যু (কাদের মোল্লার রায় এবং এর পূর্ব-পর)


যুদ্ধপরাধী কাদের মোল্লার বিচারের রায়ের পরে দেশে অনেক কিছু ঘটেছে। এর মধ্যে প্রধান প্রধান ব্যাপার গুলোয় সবাই এর মনোযোগী যে কয়েকটা ব্যাপারে কোথাও কোন কথা দেখলাম না। এর মধ্যের কিছু ব্যাপারে আমি আমার অভিমত এখানে দেওয়ার চেষ্টা করলাম।

প্রথমটা আমাদের মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রীর "যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়" এর ব্যাপারে অবস্থান।সাম্প্রতিক সময়ে উনি দেশের অবস্থা বর্হিবিশ্বের সামনে তুলে ধরার জন্য একটা বিদেশী পত্রিকায় আর্টিকেল লিখেছেন। তার মানে দাঁড়াচ্ছে দেশের ব্যাপারে উনি সচেতন আছেন এবং দেশের যেকোন পরিস্থিতি সম্পর্কে উনি জ্ঞাত আছেন। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে উনি "যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়" এবং এর পরের গন-আন্দোলন এর ব্যাপারেও জ্ঞাত আছেন বলে আমরা ধরে নিতে পারি। এখন পর্যন্ত এই ব্যাপারে কোথাও তিনি অভিমত দিয়েছেন এরকমটা আমার জানা নাই। আমাদের এই মহান নেত্রী এখন শুধু বিরোধী দলীয় নেত্রীই নন, উনি দেশের দুইবারের নির্বাচিত(আর একবারে জোড় করে দখলকৃত) প্রধান মন্ত্রীও ছিলেন। অথচ উনার কাছ থেকে আমরা এখন পর্যন্ত উনার অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারলাম না। দেশের একজন নির্দলীয় সাধারন মানুষ হিসেবে আমি এই ব্যাপারে হতাশা প্রকাশ করছি। সাথে সাথে এটাও বলা প্রয়োজন, উনি উনার দলের সমর্থকদের সাথে কি বেইমানি করছেন না? দেশের একটা অংশ(যারা মন প্রান দিয়ে বিএনপি করে)কে কি আপনি অস্বস্থির মধ্যে ফেলে দিচ্ছেন না? মনে রাখবেন, এর দায় আপনাকেই নিতে হবে।

আরেকটা ব্যাপার আমাকে অবাক করেছে। সেটা হল, সরকারের নাকি "যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়" এর ব্যাপারে আপিলের সুযোগ নেই। আইনে নাকি সেটা রাখা হয়নি। এই ব্যাপারটা কিন্তু দুইটা ব্যাপার ইঙ্গিত করছে। এক, হয় যেসকল আইনজ্ঞ ব্যাক্তি এই আইন প্রনয়নের সাথে যুক্ত ছিলেন অথবা যেসকল ব্যাক্তি এই বিচারের আইনগত ব্যাপার দেখেছেন তারা যথেষ্ট যোগ্যতা সম্পন্ন ছিলেন না। অথবা, এই বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইবুন্যালের উপর সরকারের পূর্ন আস্থা ও নিয়ন্ত্রন ছিল। যদি ব্যাপারটা এটা হয়, সেক্ষেত্রে সরকার নিজেই এই বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। যদি উপরের দুইটা অবস্থানের বাইরে অন্য কিছু হওয়া সম্ভব না হয়ে থাকে, তাহলে আমার প্রশ্ন - এর দায় কার উপর বর্তাবে? নিশ্চয়ই আমাদের আইন মন্ত্রনালয়ের উপর। এবং মন্ত্রনালয়ের প্রধান হিসেবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রীর অবশ্যই এর দায় নেওয়া উচিত এবং এরকম একটা স্পর্শকাতর ইস্যুতে দ্বায়িত্ব পালনে ব্যার্থতাহেতু উনাদের পদত্যাগ করা উচিত।

এখন দেখা যাক, আমাদের মাননীয় বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং আইন মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী এর আগে এই "যুদ্ধাপরাধীদের বিচার" ইস্যুতে আমাদেরকে কি বলেছিলেনঃ
মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী ঃ আমরা চাই এই বিচার হোক। কিন্তু সেটা আন্তর্জাতিক আইনে হতে হবে।
আইন মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী ঃ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই হবে!

আমার প্রশ্ন, আমাদের বিরোধী দলীয় নেত্রী যদি আসলেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চান তাহলে দেশের স্বার্থে কি উনি পারতেন না এই বিচার কিভাবে আইন সন্মত ভাবে করা যায় সেটার এটা ফর্মুলা দেশের জনগনের সামনে অথবা সংসদে তুলে ধরতে? পারতেন না কেন এই বিচারের আইন আন্তর্জাতিক আইনে হচ্ছে না সেটার জন্য আন্দোলন করতে?

আমার আরেকটি প্রশ্ন আইন মন্ত্রী আর প্রতিমন্ত্রীর জন্য। আপনাদের কি সরকারের আইন বিভাগের দ্বায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মাইকের সামনে গলাবাজী করার জন্য? গলাবাজী আপনারা তারপরও করতেই পারেন। সেটা আপনাদের রাজনৈতিক অধিকার। কিন্তু আপনাদের উপর যেই দ্বায়িত্ব জনগন বিশ্বাস করে তুলে দিয়েছিল, আপনাদের কি উচিত ছিল না সেটা সঠিক ভাবে পালন করা? আপনারা কোন মুখে এখনো মন্ত্রীর চেয়ারে থেকে এটা দেশের জনগনকে বুঝাতে চান যে সরকার আপিল করবে? কেন/কাদের জন্য/কি উদ্দেশ্যে আইনে ফাঁক রেখে এই "যুদ্ধাপরাধীদের বিচার" কে আপনারা প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন?

সর্বশেষ আরেকটি ব্যাপারে আমার দৃষ্টি এসেছে, জামায়েত-ই-ইসলামী দলকে রাজনীতি থেকে বহিস্কারের ব্যাপারে। এই ব্যাপারে আমি আমার পরের লেখাতে কিছু শেয়ার করার চেষ্টা করব।

সোমবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১২

বঙ্গমাতার সন্তান যারা ...


আপনি কি বিশ্বজিত ভাই কে নিয়ে চিন্তিত? কিংবা দুঃখিত? কিংবা হতাশ? অথবা আপনি কি এই মুহুর্তে নিজেকে নিয়ে চিন্তিত? ... এই তো ঠিক লাইনে আসছেন! আপনি আমি কেন বিশ্বজিতকে নিয়ে চিন্তিত হব? সে একজন সাধারন, অতি তুচ্ছ মানুষ। মৃত্যুর পরে সে নিউজের লিড জায়গা পেয়েছে, বিএনপি কর্মী খেতাব পেয়েছে, ছাত্রলীগ কর্তৃক কোপ খাওয়া বিশেষন পেয়েছে ... আর কি চাই একটা মানুষের জীবনে? মরুক সে, আমার কি?

আমি বরং কিছুটা চিন্তিত আমাকে নিজেকে নিয়ে, কবে যেন আমাকে শিকে ঝুলায়ে আগুনে পোড়ায়। আচ্ছা, আপনি কি ওই বাসের নিচে পিষ্ঠ হওয়া পিকেটার কথা ভাবছিলেন কখনো? মানে, জীবনের একেবারে শেষ মিনিটে ওর মাথায় কি ছিল? ঠিক যখন ওর মাথাটা থেতলে যাচ্ছিল, তখন কি ও একটিবারের জন্য ভাবছিল ও কেন মারা যাচ্ছে? ও কি ওর বাসায় বৃদ্ধ বাবা কিংবা মায়ের কথা ভাবছিল? ছোট আদরের বোন কিংবা সদ্য বিবাহিত লাল টুকটুকে বউটার কথা একটি বারের জন্যও ভাবছিল? নাকি ভাবছিল সেই নেতাটির কথা যে ওকে বাসে আগুন দিতে বলেছিল?

মজার কথাটা কি জানেন? আজকে যদি ওই বাসটি ওকে না পিষে থামাত, তাহলে আমার আরো অনেক গুলো মানুষকে নিয়ে(যারা ওই বাসে ছিল)লিখতে হত হয়ত। পেপারওয়ালাদের আরো কিছু কাগজ বেশী খরচ করতে হত বাসের ভিতরে পুড়ে যাওয়ার মানুষগুলোর জন্য রিপোর্ট বাবদ। সে যাকগে, আসল কথায় আসি! আপনি কি আজকে মারা যাওয়া চার জন এর কাউকে নিয়ে মনের ভিতরে দুঃখ পেয়েছেন? আপনি নিশ্চিত থাকুন, আপনি কেন, আমি নিজেও দুঃখ পাইনি। এইযে যা লিখছি সব সস্তা পাবলিসিটি। মানুষ পড়বে, লাইক দিবে, বেশি ভাল লাগলে শেয়ার দিবে, কমেন্ট করবে। খুব করে বলবে, "বাহ! ছেলেটা লেখে জব্বর!"

এগুলো যখন ঘটছিল আমি কিন্তু তখন চিন্তা করছিলাম অ্যাসাইনমেন্টটি নিয়ে যেটা সাবমিট করলে আমার রেজাল্ট ভাল হবে, আমি ভবিষ্যতে বেশী বেশী ইনকাম করব। কিংবা আমি ভাবছিলাম কিভাবে ঘুমায়ে ঘুমায়ে দিনটাকে ইনজয় করা যায়, অথবা মিস করছিলাম ইউনির আড্ডা গুলোকে। মাঝে মাঝে অবশ্য আমার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতে ইচ্ছা করছিল যে, "ধুর কাজের সময়ে হরতাল দিতে পারে না! আকাইম্মা টাইমে ঠিকই হরতাল দিছে।" মানে কিন্তু খুব সোজা, আমার মাথায় বিশ্বজিতরা নেই। থাকবে কেন? ও তো আমার দাদা না। ও তো দেশের সেরা ক্রিকেটার না যে ওর কবে বিয়ে হবে সেটা নিয়ে খুব এক্সাইটেড হয়ে আমি নিউজের পাতা উল্টাবো। সব থেকে বড় কথা, ওকে নিয়ে ভাবতে হবেই বা কেন? আমার দেশে কি মানুষ কম আছে? এরকম দুই একটা আমজনতা চলে গেলে আমার কি? এরকম ঘটনা কি একেবারেই নতুন?

ঘটনা কিন্তু আজকে একদিনে হয়নি। এরকম আরো অনেক বিশ্বজিতরা রাস্তায় মার খেয়েছে। হয় এদলের, নয় ওদলের। গনতন্ত্রের দোষ কোথায় জানেন? অন্য সকল তন্ত্রের দোষগুলি ধরতে গিয়ে কখন যে নিজের তন্ত্রটিই হারিয়ে ফেলে, নিজেও জানে না সেটি। এই আমরাই কিন্তু নেতাদের নির্বাচিত করি, এইদফা এই নেতা, পরেরবার ওই নেতা। আমাদের চয়েজ কিন্তু খুব সোজা, এ নয়ত সে! 

আমরা আসলে মনে হয় আশ্চর্য হওয়ার ক্ষমতাটাই হারিয়ে ফেলেছি। আসলেই হারিয়ে ফেলেছি। এই যে দিনের আলোতে টিভি ক্যামেরার সামনে বিশ্বজিত ভাই কোপ খেলো, কেন জানেন? নেতারা অ্যাকশান চায়, মৃত বডি চায়! আমরা নেতার পোষা কুকুর হয়ে গিয়েছি। আমরা আমাদের নিয়তি মেনে নিয়েছি। আমরা কুকুরের থেকেও অধম হয়ে গিয়েছি। আমরা হায়না পশু হয়ে গিয়েছি। এ তো গেল নেতাদের গল্প, আমাদের গল্প কি জানেন? আমরা যেইটা করব, চ্যানেল ঘুরায়ে ঘুরায়ে এই একি ঘটনা দেখব। নানা অ্যাঙ্গেলে কোপ গুলা অ্যানালাইসিস করব। খুব আফসোস করব, এর পরেই রাতের ডিনারটা সেরে ফেলব পরিবারের সাথে। এরপর ফেসবুকে বসব স্ট্যাটাস দেওয়ার জন্য। আমাদেরই বা কি দোষ বলুন, আমাদের এর থেকে করারই তো নাই কিছু। যদি কিছু করার থাকে তো আমাদের বাপ কিংবা মামাদের আছে। মানে, আমাদের যাদের বাপের পয়সা আছে তারা বিদেশে চলে যাব, আর যাদের বাপের পয়সা নাই কিন্তু হালকার উপর "মামা" আছে তারা সরকারী চাকুরি নিয়ে দেশটাকে চুষে খাব। এরপরে যারা বাকি থাকবে, তারাই না হবে বিশ্বজিত? আমরা নাকি বঙ্গ'মাতার সন্তান! জয় বঙ্গমাতা!